ডেঙ্গু হবার আগে এবং পরে

Sharing is caring!

ডেঙ্গু একটি আতঙ্কের নাম

মমিন সাহেবের আদরের দুই সন্তান-রাইয়ান ও মালিহা। ১১ বছর বয়সী রাইয়ান ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে শেষ পর্যন্ত হেরে গেছে।

পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ! এর থেকে কষ্টের আর কি হতে পারে? এতেও নিস্তার মেলেনি মমিন সাহেবের।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে ছোট্ট মালিহা।  শুধু মমিন সাহেব নন, তার মতো এমন আরো অনেক পরিবার ইতিমধ্যে তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে।

বড় রোগকে যখন বিজ্ঞান হারিয়ে দিচ্ছে, তখনো ছোট্ট একটা এডিস মশার কাছে আমরা অসহায়। এমনকি এই জ্বরের কোন ভ্যাক্সিন এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি।

একটু অসতর্কতার জন্য অকালেই অনেক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। অন্য যেকোন বছরের তুলনায় বাংলাদেশেও এবছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুসংখ্যা রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অশনিসংকেত। মূলত বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পায়। বদ্ধ, স্বচ্ছ পানিতে ডেঙ্গুর জন্ম ও বংশবিস্তার ঘটে।

ডেঙ্গু দমনের অনেক পন্থা থাকলেও কার্যকরী পদক্ষেপ হচ্ছে কোথাও কোন পাত্রে পানি জমতে না দেয়া।

একনাগারে তিন থেকে চারদিন কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশা ডিম পেরে বংশবৃদ্ধি করে। এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির স্ত্রী মশা শুধুমাত্র ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে।

মশা অত্যন্ত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী এবং আমরা যেহেতু স্ত্রী/পুরুষ মশা চিহ্নিত করতে পারি না।

সেজন্য  আমাদের উচিত সময় থাকতে সাবধান হওয়া। ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ, চিকিৎসা সম্বন্ধে জেনে নেয়া যাক-

 

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ

ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ-(dengue fever symptoms)

  • ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর দেহে ১০১-১০২° ডিগ্রি জ্বর থাকবে ।
  • বমি হতে পারে।
  • চোখ ব্যথা (অক্ষিকোটরের পিছন দিকে ব্যথা), মাথা ব্যথা থাকবে। শরীরেও ভীষণ ব্যথা হয়।
  • শরীরে প্রচুর র্যাস বা ফুসকুড়ি হবে এবং সেখানে প্রচুর চুলকাবে।
  • শরীরের বিভিন্ন স্থানে মাংসপেশি লাল হয়ে যাবে।
  • রক্তপাত হতে পারে (নাক-মুখ দিয়ে)। মেয়েদের পিরিয়ডকালীন সময়ে রক্তপাত অনেক দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।
  • এমনকি পায়খানার সাথে রক্ত যেতে পারে কিংবা পায়খানা কালো বর্ণের হবে।
  • পাতলা পায়খানা হতে পারে।
  • অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।
  • কিডনি ফেইলর হতে পারে। হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
  • রক্তের প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকা কমে যাবে। অনুচক্রিকা যদি ১০০০০ হাজারের নিচে হয় তাহলে রোগীকে অবশ্যই রক্ত দিতে হবে।

 

আক্রান্তের ব্যক্তিদের সকলের যে সবগুলো লক্ষণই দেখা দেবে এমন কোন কারন নেই । এর কারণ হচ্ছে ডেঙ্গু জ্বর তিন ধরনের হয়ে থাকে।

ক্যাটাগরি- এ, বি, সি। এ ক্যাটাগরি সেরে উঠতে বেশি সময় লাগে না। বি ক্যাটাগরিতে অল্প কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। এটাও সঠিকভাবে চিকিৎসা নিলে দ্রুত রোগী সেরে উঠবে।

তবে সি ক্যাটাগরি ভয়ংকর এবং এতে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এজন্য ডেঙ্গু আশঙ্কা হলেই রোগীর রক্ত পরীক্ষা- সিবিসি এবং NS1 এই দুটি টেস্ট করাতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে।

dengue fever symptoms

চিকিৎসা(ডাক্তার এর পরামর্শ ছাড়া মেডিসিন নিবেন না)

  • কোন প্রকার এসপিরিন বা অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ সেবন করা যাবে না।
  • রোগীকে সবসময় মশারির ভিতর রাখতে হবে। এমনকি দিনের বেলাতেও। ডেঙ্গু আক্রান্ত কোন রোগীকে সাধারণ মশা কামড়ালে ঐ মশাটিও ডেঙ্গু জীবাণু বহন করে।
  • প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে।
  • বাড়িতে বানানো শরবত, ফলের রস, ওরাল স্যালাইন খাওয়াতে হবে। সাথে প্রচুর পানি এবং তরল জাতীয় খাদ্য খেতে হবে।
  • শরীর বার বার মুছিয়ে দিতে হবে। ডেঙ্গু সেরে যাবার ২-৩ দিন পরও আবার জ্বর হতে পারে। এজন্য ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে।
  • ক্যাটাগরি সি টাইপ জ্বর হলে রোগীকে হাসপাতালে রাখাই শ্রেয়।
  • ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না।

 

প্রতিরোধ- ডেঙ্গু প্রতিরোধ নিজেদেরকেই করতে হবে। গ্রামের তুলনায় শহরে ডেঙ্গু প্রকোপ বেশি। এজন্য আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোথায় ভ্রমণ না করাই ভালো যাতে মশার মাধ্যমে অন্যদের মাঝে না ছড়ায়।

ঘরের টব, ফুলদানি, এয়ারকন্ডিশন, ফ্রিজের পিছনে অথবা বাড়ির আশেপাশের কোথাও যেন ভাঙা পাত্রে পানি জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। নিজ থেকেই পরিষ্কার করতে হবে।

বাড়ি, পাড়া, গ্রাম, অফিস সর্বত্র পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। দিনের বেলা ঘুমানোর সময় মশারি লাগিয়ে ঘুমাতে হবে। কিংবা মশার কয়েল, এরোসল ব্যবহার করতে হবে।

 

মোটকথা, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজেকে সাবধান হতে হবে এবং অন্যদেরকেও সচেতন করতে হবে। এক্ষেত্রে জনসচেতনতার কোন বিকল্প নেই।